সাময়িক বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রবায়ু, স্থলবায়ু ও মৌসুমীবায়ু: Sea Breeze, Land Breeze & Monsoon.

সাময়িক বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রবায়ু, স্থলবায়ু ও মৌসুমীবায়ু: Sea Breeze, Land Breeze & Monsoon.

সাময়িক বায়ুপ্রবাহ কাকে বলে?

দিনের বিভিন্ন সময়ে বা বছরের বিভিন্ন ঋতুতে স্থলভাগ ও জলভাগের তাপমাত্রা ও বায়ুচাপের পার্থক্যের কারণে যে বায়ুর দিক বা প্রবাহ পরিবর্তিত হয়, তাকে সাময়িক বায়ুপ্রবাহ বলে। এগুলি স্থায়ী নয়; নির্দিষ্ট সময় বা ঋতু অনুযায়ী এদের দিক পরিবর্তিত হয়। সাময়িক বায়ুপ্রবাহ প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত—

  • সমুদ্রবায়ু
  • স্থলবায়ু
  • মৌসুমীবায়ু

সমুদ্রবায়ু (Sea Breeze)

যে বায়ু দিনের বেলায় সমুদ্র বা জলভাগ থেকে স্থলভাগের দিকে প্রবাহিত হয়, তাকে সমুদ্রবায়ু বলে।

সমুদ্রবায়ুর সৃষ্টি-কারণ:

স্থলভাগ খুব দ্রুত উত্তপ্ত হয় এবং জলভাগ ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়। দিনের বেলায় স্থলভাগ বেশি উষ্ণ হয়ে সেখানে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। অপরদিকে সমুদ্র অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা থাকে ও সেখানে উচ্চচাপ এলাকায় পরিণত হয়।
ফলে সমুদ্রের ঠান্ডা, ভারী বায়ু স্থলভাগের নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়—এটিই সমুদ্রবায়ু।

সমুদ্রবায়ুর বৈশিষ্ট্য:

  • এটি সাধারণত দিনের বেলায় প্রবাহিত হয়।
  • দুপুর থেকে বিকেল এবং সন্ধ্যার দিকে এর বেগ সর্বাধিক হয়।
  • সমুদ্রবায়ুর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু দেখা যায়।
  • এটি স্থলভাগকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।

স্থলবায়ু (Land Breeze)

যে বায়ু স্থলভাগ থেকে সমুদ্র বা জলভাগের দিকে সাধারণত রাতের বেলায় প্রবাহিত হয়, তাকে স্থলবায়ু বলে।

স্থলবায়ুর সৃষ্টি-কারণ:

রাতে স্থলভাগ দ্রুত ঠান্ডা হয়ে পড়ে; ফলে সেখানে উচ্চচাপ সৃষ্টি হয়।
অপরদিকে সমুদ্র সারাদিনের সঞ্চিত তাপ ধীরে ধীরে বিকিরণ করে গরম থাকে। তাই সমুদ্রের উপরে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়।
ফলে স্থলভাগের শীতল ও ভারী বায়ু সমুদ্রের নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয়—এটাই স্থলবায়ু।

স্থলবায়ুর বৈশিষ্ট্য:

  • সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত প্রবাহিত হয়।
  • মধ্যরাত্রি থেকে ভোররাত্রির মধ্যে এর বেগ সর্বাধিক হয়।
  • স্থলবায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম থাকে, তাই বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে না।

মৌসুমীবায়ু (Monsoon Winds)

‘মৌসম’ শব্দের অর্থ ঋতু। ঋতু পরিবর্তনের কারণে স্থলভাগ ও জলভাগের বায়ুচাপ ও তাপমাত্রার যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়, তার ফলে যে বায়ুপ্রবাহ তৈরি হয়, তাকে মৌসুমীবায়ু বলা হয়।
মৌসুমী বায়ু মূলত সমুদ্রবায়ু ও স্থলবায়ুর বিশাল আকারের সংস্করণ

এশিয়ার দক্ষিণে বিস্তৃত ভারত মহাসাগর এবং উত্তরে বিশাল স্থলভাগের অবস্থান মৌসুমি বায়ু গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গ্রীষ্মকালীন মৌসুমীবায়ু (South-West Monsoon)

গ্রীষ্মকালে উত্তর গোলার্ধে স্থলভাগ অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায়। ফলে ভারত ও এশিয়ার বিস্তীর্ণ অংশে নিম্নচাপ বলয় সৃষ্টি হয়। অপরদিকে দক্ষিণ গোলার্ধে তখন তুলনামূলকভাবে শীতকাল, তাই সেখানে উচ্চচাপ বলয় তৈরি হয়।

এই উচ্চচাপ থেকে বায়ু উত্তর দিকের নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয়। পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে (ফেরেলের সূত্রানুযায়ী) এই বায়ু ডানদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়; তাই এর নাম দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু

গ্রীষ্মকালীন মৌসুমীবায়ুবৈশিষ্ট্য:

  • এটি সমুদ্রের ওপর দিয়ে আসে, তাই প্রচুর জলীয় বাষ্প বহন করে।
  • ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, চীন, জাপানসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।
  • আরব সাগর শাখা ভারতের পশ্চিম উপকূলে, আর বঙ্গোপসাগর শাখা পূর্ব ভারত, বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রবল বর্ষা আনে।

শীতকালীন মৌসুমীবায়ু (North-East Monsoon)

শীতকালে উত্তর গোলার্ধে তাপমাত্রা কমে গিয়ে স্থলভাগে উচ্চচাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধে তখন গ্রীষ্মকাল হওয়ায় সমুদ্রের ওপরে নিম্নচাপ থাকে। ফলে স্থল থেকে সমুদ্রের দিকে বায়ু প্রবাহিত হয়।

পৃথিবীর আবর্তনের কারণে এই বায়ু বাঁদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়; তাই এর নাম উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু

শীতকালীন মৌসুমীবায়ুবৈশিষ্ট্য:

  • স্থলভাগের ওপর দিয়ে আসায় জলীয় বাষ্প কম থাকে।
  • সাধারণত বৃষ্টিপাত ঘটায় না।
  • তবে বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় জলীয় বাষ্প সংগ্রহ করে ভারতের তামিলনাড়ুশ্রীলঙ্কায় শীতকালে বর্ষা আনে।
  • দক্ষিণ গোলার্ধে গিয়ে এটি উত্তর-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বৃষ্টি ঘটায়।

উপসংহার

সাময়িক বায়ুপ্রবাহ পৃথিবীর স্থানীয় ও আঞ্চলিক জলবায়ুর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। সমুদ্রবায়ু ও স্থলবায়ু উপকূলীয় অঞ্চলে দিন-রাতের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, আর মৌসুমিবায়ু দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশকে প্রভাবিত করে। বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কৃষিজীবন সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। তাই সাময়িক বায়ুপ্রবাহ জলবায়ুবিজ্ঞানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

Sukanta Das is the founder of Studyniea.in. He holds a Master’s degree (M.A) in Political Science and has a strong passion for education, especially in the fields of general studies and current affairs. With years of academic experience and a clear understanding of students' needs, he created Studyniea.in to offer reliable, easy-to-understand, and exam-focused content for learners preparing for school exams and competitive government exams. His mission is to build a supportive learning platform where students can grow their knowledge and confidence, step by step.

Post Comment

error: Content is protected !!