পৃথিবীর গতি: আবর্তন ও পরিক্রমণ (prithibir-goti-abartan-o-parikraman).
পৃথিবী একটি গতিশীল গ্রহ। এটি ক্রমাগত দুটি প্রধান ধরনের গতি সম্পন্ন করে—আবর্তন গতি (আহ্নিক গতি) ও পরিক্রমণ গতি (বার্ষিক গতি)। এই দুটি গতি পৃথিবীতে দিন-রাত্রির আবর্তন, ঋতু পরিবর্তন, ও সময়ের বিভাজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনাসমূহের মূল কারণ।
আবর্তন গতি বা আহ্নিক গতি:
পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে যে ঘূর্ণন করে, তাকে আবর্তন গতি বলে। পৃথিবীর অক্ষ কক্ষতলের সঙ্গে প্রায় ৬৬½° কোণে হেলানো অবস্থায় থাকে। এই অবস্থায় পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে একটানা লাটুর মতো ঘুরতে থাকে।
পৃথিবীর একবার সম্পূর্ণ আবর্তন করতে সময় লাগে —
👉 ২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট ৪ সেকেন্ড, অর্থাৎ প্রায় ২৪ ঘণ্টা বা ১ দিন।
এই কারণে একে আহ্নিক গতি বলা হয় (অহ্ন অর্থ ‘দিন’)।
আবর্তন গতির ফলে দিন ও রাত্রির সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর যে অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে, সেখানে দিন হয়; আর অপর অংশে রাত হয়।
আবর্তন গতির বেগ:
- নিরক্ষরেখায় সবচেয়ে বেশি — প্রায় ১৬৭৪ কিমি/ঘণ্টা।
- মেরুর দিকে গেলে এই বেগ ক্রমশ কমে গিয়ে মেরুতে প্রায় শূন্য হয়।
পরিক্রমণ গতি বা বার্ষিক গতি:
পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে ঘূর্ণন করতে করতে সূর্যের চারদিকে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে প্রদক্ষিণ করে। এই গতিকে পরিক্রমণ গতি বলা হয়।
পৃথিবীর সূর্যকে একবার সম্পূর্ণ প্রদক্ষিণ করতে সময় লাগে —
👉 ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড, অর্থাৎ প্রায় এক বছর।
তাই এই গতিকে বলা হয় বার্ষিক গতি।
পরিক্রমণ গতির বেগ:
পৃথিবীর গড় পরিক্রমণ গতি প্রায় ৩০ কিমি প্রতি সেকেন্ড।
পৃথিবীর আবর্তন গতি ও পরিক্রমণ গতির ফলাফল:
পৃথিবীর দুটি প্রধান গতি—আবর্তন (Rotation) ও পরিক্রমণ (Revolution)—পৃথিবীতে নানা প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণ। এই দুই গতির ফলেই দিন-রাত্রির পরিবর্তন, ঋতু পরিবর্তন, সময়ের পার্থক্য এবং জলবায়ুর বৈচিত্র্য দেখা যায়। নিচে উভয় গতির ফলাফল বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো—
আবর্তন গতির ফলাফল (Results of Rotation):
১. দিন ও রাত্রির সৃষ্টি:
পৃথিবী নিজের অক্ষের উপর পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘূর্ণন করার ফলে পৃথিবীর যে অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে, সেখানে দিন হয় এবং যে অংশ সূর্যের বিপরীতে থাকে, সেখানে রাত হয়।
২. দিন ও রাত্রির ক্রমাগত আবর্তন:
পৃথিবী অবিরত ঘূর্ণায়মান থাকার কারণে দিন ও রাত একে অপরের পর পর ঘুরে আসে। ফলে সময়ের বিভাজন ঘটে—সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা ও রাত।
৩. সময় গণনা ও দ্রাঘিমার পার্থক্য:
পৃথিবীর আবর্তনের ফলে দ্রাঘিমার পার্থক্য অনুযায়ী বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সময়ের পার্থক্য দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ভারত ও ইংল্যান্ডের সময়ের মধ্যে প্রায় ৫ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের ব্যবধান।
৪. ঘূর্ণনজনিত বায়ুপ্রবাহের দিক পরিবর্তন (Coriolis Effect):
পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে বায়ু ও সাগর স্রোতের দিক বাঁক নেয়—উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে ও দক্ষিণ গোলার্ধে বাঁদিকে।
৫. মেরু চাপা ও নিরক্ষীয় স্ফীতি:
ঘূর্ণনের ফলে পৃথিবী সম্পূর্ণ গোলাকার নয়—বরং মেরু অঞ্চলে সামান্য চাপা ও নিরক্ষরেখায় ফোলা আকার ধারণ করেছে।
পরিক্রমণ গতির ফলাফল (Results of Revolution):
১. ঋতু পরিবর্তন:
পৃথিবী সূর্যের চারদিকে হেলানো অক্ষসহ পরিক্রমণ করার ফলে বিভিন্ন সময়ে সূর্যের কিরণ পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন অংশে পড়ে। এর ফলে বছরে চারটি ঋতুর সৃষ্টি হয়—বসন্ত, গ্রীষ্ম, বর্ষা (বা শরৎ) এবং শীত।
২. দিন ও রাত্রির দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন:
পৃথিবীর অক্ষ হেলানো থাকার কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হয়। যেমন—গ্রীষ্মে দিন দীর্ঘ ও রাত ছোট, আর শীতে রাত দীর্ঘ ও দিন ছোট হয়।
৩. অয়ন ও বিষুবের সৃষ্টি:
বছরে দু’বার (২১ মার্চ ও ২৩ সেপ্টেম্বর) সূর্য বিষুবরেখার উপর লম্বভাবে অবস্থান করে—তখন দিন ও রাত সমান হয় (বিষুব)।
আবার ২১ জুন ও ২২ ডিসেম্বর সূর্য যথাক্রমে কর্কট ও মকরক্রান্তি রেখার উপর লম্বভাবে পড়ে—যা অয়ন নামে পরিচিত।
৪. বছরের বা ক্যালেন্ডারের সৃষ্টি:
পৃথিবীর সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ৩৬৫ দিন সময় লাগে। তাই পরিক্রমণের ভিত্তিতেই সৌর বর্ষ বা এক বছরের ধারণা তৈরি হয়েছে।
৫. বিভিন্ন অক্ষাংশে জলবায়ুর পার্থক্য:
পরিক্রমণের ফলে সূর্যের তাপ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ভিন্নভাবে পড়ায় জলবায়ুর ভিন্নতা সৃষ্টি হয়—যেমন গ্রীষ্মমণ্ডলীয়, নাতিশীতোষ্ণ ও শীতল জলবায়ু অঞ্চল।
উপসংহার:
সার্বিকভাবে বলা যায়, পৃথিবীর আবর্তন ও পরিক্রমণ—এই দুটি গতি প্রকৃতির এক অপরিহার্য নিয়ম। আবর্তনের ফলে দিন ও রাত্রির আবর্তন ঘটে, সময়ের পার্থক্য সৃষ্টি হয় এবং পৃথিবী তার ভারসাম্য বজায় রাখে। অপরদিকে পরিক্রমণের ফলে ঋতু পরিবর্তন, দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন এবং জলবায়ুর বৈচিত্র্য দেখা দেয়। অর্থাৎ, পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এই দুটি গতি অপরিসীম ভূমিকা পালন করে। যদি পৃথিবী এই গতিগুলি না করত, তবে দিন-রাত্রি, ঋতু বা সময়ের কোনো ধারণাই থাকত না এবং পৃথিবী প্রাণহীন গ্রহে পরিণত হতো। তাই বলা যায়—পৃথিবীর আবর্তন ও পরিক্রমণই জীবনের মূল ছন্দ।



Post Comment